ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬ , ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতিদিন গড়ে ১০ খু'ন, নিয়ন্ত্রণহীন স'হিং'স'তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-২৫ ১১:৪৬:০৬
প্রতিদিন গড়ে ১০ খু'ন, নিয়ন্ত্রণহীন স'হিং'স'তা প্রতিদিন গড়ে ১০ খুন, নিয়ন্ত্রণহীন সহিংসতা

‎নিজস্ব প্রতিবেদক 
রংপুরে একটি বাসায় শিক্ষকপরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে উদ্বেগের কারণ শুধু এই একটি ঘটনা নয়; গত কয়েক মাস ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটছে।


পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মে থেকে জুলাই- এই তিন মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৯৩৪টি মামলা হয়েছে। অর্থাৎ, এই সময়ে মাসে গড়ে ৩১১টির বেশি খুনের মামলা হয়েছে। সে হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ১০টির বেশি হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে খুনের ঘটনা সেভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি মাসে কমবেশি ৩০০ খুনের ঘটনা ঘটছে। গড়ে প্রতিদিন ১০টা করে খুন যেন আমাদের ভাগ্যে লেখা রয়েছে।’

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২ হাজার ৭৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭, এপ্রিলে ২৮৮, মে মাসে ৩১০, জুনে ৩২৬ এবং জুলাইয়ে ২৯৮টি মামলা হয়েছে।

পুলিশ অবশ্য বলছে, এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।


রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব

হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও মব সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।

অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, ক্ষমতার আধিপত্য, রাজনৈতিক সংঘাত, মাদক এবং পারিবারিক কলহ বা বিরোধ—এসব কারণে দেশে হত্যাকাণ্ড বেশি ঘটছে। অপরাধ দমনে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, এখন অনেক মানুষের হাতে অস্ত্র চলে গেছে। অবৈধ অস্ত্রের চোরাচালানও বাড়ছে। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক বিরোধ ও ক্ষমতার আধিপত্যের কারণে খুন ও সহিংসতা বাড়ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। বিভিন্ন থানায় হামলা ও অস্ত্র লুটের ঘটনাও ঘটে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

তবে পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় বর্তমান নির্বাচিত সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ৯টি।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাতেও বেড়েছে মামলা। গত ছয় মাসে এ ধরনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে মামলা হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। অর্থাৎ মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি।

খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, দস্যুতা, ডাকাতি ও চুরির ঘটনা কমলেও খুনের ঘটনা খুব একটা কমেনি। স্থানীয় বিরোধ ও মানুষের মধ্যে অস্থিরতা অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে পুলিশ তাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


রাজনৈতিক কোন্দলে বাড়ছে সহিংসতা

রাজনৈতিক কোন্দলও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। গত রোববার, ২৩ আগস্ট রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা আল আমিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি, জামায়াত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এনসিপির মধ্যে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ৪০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন। নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৭ জন।

এর মধ্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘাতে নিহত হয়েছেন চারজন। জামায়াত ও বিএনপির সংঘাতে নিহত হয়েছেন নয়জন। আর বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১৬ জন।

বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক কারণ গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ৭৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪০ জন দুর্বৃত্তদের হামলা ও গুলিতে নিহত হয়েছেন।

মানবাধিকারকর্মী ও বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন এলিনা খান বলেন, নির্বাচিত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা বাড়ছে। পদ-পদবি নিয়ে সংঘাত হচ্ছে। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।

তবে পুলিশ বলছে, রাজনৈতিক কোন্দল আগেও ছিল, এখনো আছে। সব রাজনৈতিক সংঘাত চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা আগে থেকেই ঘটে আসছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে পুলিশের ওপর কোনো ধরনের চাপ নেই। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে।


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

চলতি বছরে ঢাকার মিরপুরে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রধানমন্ত্রী তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং দ্রুত বিচারের আশ্বাস দেন। ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আটক করে পুলিশ। ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় মামলার রায়ও দেন ঢাকার নিম্ন আদালত।

অপরাধ বিশ্লেষকেরা বলছেন, রামিসার ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দেশে প্রতিনিয়ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু সব ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।

তাদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো আগের মতো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এই সুযোগে খুন, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধ বাড়ছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, খুন ও সহিংসতার মতো অপরাধ বাড়লেও তা দমনে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এ জন্য সরকারের বিশেষায়িত অভিযান পরিচালনা করা দরকার। ২০২৪ সালের আগস্টের পর পুলিশের অনেক সদস্য মনোবল হারিয়েছেন এবং অনেকে ভয় নিয়ে কাজ করছেন।


মব সহিংসতাও থামছে না

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশে মব সহিংসতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এ ধরনের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি ৫০ জন নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রামে নিহত হয়েছেন ৩১ জন।

মানবাধিকারকর্মী এলিনা খান বলেন, এটি একটি নির্বাচিত সরকার। মানুষ নিরাপত্তা চায়। যেকোনো মূল্যে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

তবে অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, আগের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তুলনায় এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

তারপরও প্রতিদিন গড়ে ১০টির মতো হত্যাকাণ্ডের মামলা হওয়া, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং মব সহিংসতার ধারাবাহিক ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, খুন ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানো, রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।



 

 

 



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ